আমজাদ হোসেন,কুমিল্লা জেলা (উত্তর) প্রতিনিধি :পৌষ মাসের শেষ প্রান্তে এলেই গ্রামবাংলার বাতাসে ভেসে আসে এক ভিন্ন রকমের উৎসবের ডাক। শীতের কনকনে হাওয়ার সঙ্গে মিশে যায় আনন্দ, আবেগ আর ঐতিহ্যের ছোঁয়া। ঠিক এমনই এক শতবর্ষী লোকজ ঐতিহ্যের নাম দেবিদ্বারের পোনরা মেলা—যা স্থানীয় মানুষের কাছে শুধু একটি মেলা নয়, বরং স্মৃতি, সংস্কৃতি আর গ্রামবাংলার প্রাণের উৎসব।
প্রতি বছর পৌষ সংক্রান্তি তিথিতে, যা বাংলায় সাকরাইন বা মকর সংক্রান্তি নামেও পরিচিত, কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার পোনরা এলাকায় বসে এই ঐতিহ্যবাহী মেলা। শীতের শেষ আর নতুন সময়ের আগমনের বার্তা নিয়ে এই মেলা যুগের পর যুগ ধরে চলে আসছে। এর নির্দিষ্ট কোনো শুরুর সাল না থাকলেও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী এটি একটি শতবর্ষী ঐতিহ্য, যা দেবিদ্বারের ইতিহাস ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
পৌষ মানেই শীত, আর শীত মানেই উৎসব—এটাই গ্রামবাংলার চিরচেনা বাস্তবতা। পৌষ সংক্রান্তিকে ঘিরে একসময় গ্রামজুড়ে চলত হরিনাম সংকীর্তন, মিলাদ মাহফিল, পিঠাপুলির আয়োজন আর নানা ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান। পোনরা মেলাকে কেন্দ্র করে দূর-দূরান্ত থেকে আসতেন ব্যবসায়ী, কারিগর আর দর্শনার্থীরা। মাটির খেলনা, কাঠের সামগ্রী, হাতের তৈরি পণ্য আর নানা রকম লোকজ খাবারে জমে উঠত মেলার মাঠ।
শীতের সকালগুলোতে ঘন কুয়াশায় ঢাকা গ্রাম, উঠানে রোদ পোহাতে বসা বয়স্ক মানুষ, নাতি-নাতনিকে কোলে নিয়ে সূর্যের অপেক্ষা—এসব দৃশ্য যেন পোনরা মেলার আবহের সঙ্গেই মিশে আছে। বিকেলের দিকে ঠান্ডা হাওয়ার সঙ্গে শুরু হতো উৎসবের আমেজ। তবে সময়ের পরিবর্তনে সেই দৃশ্যপট অনেকটাই বদলে গেছে।
ডিজিটাল যুগে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামবাংলার বহু লোকজ আয়োজন। একসময় ঘরে ঘরে তৈরি হতো ভাপা, পুলি, চিতই, পাটিসাপটা—আজ সেগুলো সহজেই পাওয়া যায় দোকানে। নতুন জামাই এলেও আর পিঠা বানানোর সেই ব্যস্ততা চোখে পড়ে না। ফলে পৌষ সংক্রান্তি কিংবা পোনরা মেলার মতো উৎসবগুলো আগের মতো জাঁকজমক হারাতে বসেছে।
এদিকে শীত মানেই গ্রামবাংলায় দুই রকম বাস্তবতা। কেউ উষ্ণ কাপড়ে আরামে দিন কাটান, আবার কেউ—বিশেষ করে গরিব ও ছিন্নমূল মানুষ—একটুকরো গরম কাপড়ের আশায় রাত কাটান বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন কিংবা রাস্তার পাশে। শীত সবার জন্যই আসে, আবার সবার জীবনেই ভিন্ন ভিন্ন গল্প রেখে চলে যায়।
স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা মনে করছেন, গ্রামবাংলার এই প্রাণের উৎসবগুলো যথাযথ উদ্যোগ না নিলে একদিন শুধু স্মৃতির পাতায়ই সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে। নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতি তুলে ধরতে এখনই প্রয়োজন পরিকল্পিত উদ্যোগ ও সংরক্ষণ।
তবু সব প্রতিকূলতার মাঝেও দেবিদ্বারের পোনরা মেলা আজও সাক্ষ্য দেয়—গ্রামবাংলার শিকড় এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। শীতের হিমেল হাওয়ায়, পৌষ সংক্রান্তির দিনে, এই মেলা এখনও মানুষের মনে ফিরিয়ে আনে হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যের উষ্ণ স্মৃতি।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ রবিউল হাসান
অনলাইন ইনচার্জঃ কবির মাহমুদ
অফিসঃ ফায়েনাজ টাওয়ার, ৮/এ,কালভার্ট রোড,পুরানা পল্টন, ঢাকা