
আমজাদ হোসেন(কুমিল্লা) প্রতিনিধি:কুমিল্লার দেবিদ্বারে এক কথিত আন্তঃজেলা মাদক কারবারির বাড়িতে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও তছনছের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয়দের বিরুদ্ধে। এ ঘটনার পর ওই বাড়ির বাসিন্দারা অন্যত্র চলে গেছেন বলে জানা গেছে। তবে ঘটনার দুই দিন পার হলেও এ ঘটনায় থানায় কোনো মামলা বা লিখিত অভিযোগ হয়নি।
গত রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে উপজেলার ফতেহাবাদ ইউনিয়নের নোয়াবগঞ্জ (কোটনা) কাজীবাড়ি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় সহস্রাধিক মানুষ মাদকবিরোধী বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে কাজী এনামুল হক (৩৩)-এর বাড়িতে যান। পরে সেখানে ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়। বাড়ির পীর সাহেবের দরবার কক্ষসহ প্রায় আটটি কক্ষের আসবাবপত্র তছনছ করা হয়। এ সময় আটটি খাট ও চৌকি, চারটি ফ্রিজ, দুটি সোফাসেট, টেলিভিশন, রান্নাঘর, মাটির চুলা, বাথরুম-টয়লেট, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন মালামাল ভাঙচুর করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এ সময় মূল্যবান কিছু জিনিসপত্র লুট করা হয়েছে বলেও স্থানীয় কয়েকজন দাবি করেছেন। তবে এ দাবির বিষয়ে কোনো স্বতন্ত্র প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন প্রবীণ প্রতিবেশী অভিযোগ করেন, কাজী এনামুল হক দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা ও মদ বিক্রির সঙ্গে জড়িত। তাদের দাবি, মাদক ব্যবসার অভিযোগে এনামুলকে একাধিকবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তিনি কারাভোগের পর জামিনে বেরিয়ে আবারও মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত রমজান মাস ও কোরবানির ঈদের সময় দুই দফায় গ্রামবাসী এনামুল ও তার দুই ভাইকে মাদক ব্যবসা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার অনুরোধ করেন। পরবর্তীতে আরও দুই দফায় তিন মাস করে মোট ছয় মাস সময় দেওয়া হয়। এমনকি পুনর্বাসনের জন্য ব্যবসা শুরু ও বিদেশে যাওয়ার খরচ বহনের আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল বলে জানান তারা।
স্থানীয়রা জানান, গত আগস্ট মাসে মাদকবিরোধী সচেতনতা তৈরিতে মসজিদে মসজিদে সভা ও মাইকিং করা হয়।
দুই যুবক আটকের পর বাড়িতে হামলা
ঘটনার দিন সকালে এনামুল হকের বাড়ির সামনে থেকে ইয়াবাসহ মুরাদনগর উপজেলার উত্তর ত্রিশ গ্রামের মো. রিপন হোসেন (২৮) ও সাগর (২৪) নামে দুই যুবককে স্থানীয়রা আটক করেন বলে জানা গেছে। পরে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশে হস্তান্তর করা হয়।
স্থানীয়দের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে ওই দুই যুবক কাজী এনামুল হকের কাছ থেকে ইয়াবা কেনা এবং বিকাশের মাধ্যমে টাকা পরিশোধের কথা জানিয়েছেন। এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পরই স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয় এবং মাদকবিরোধী মিছিল নিয়ে এনামুলদের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ব্যক্তি ঘটনার বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। তার দাবি, এনামুল এলাকায় প্রভাবশালী মাদক কারবারি হিসেবে পরিচিত হলেও গ্রামবাসীর সিদ্ধান্ত মেনে তিনি মাদক ব্যবসা থেকে সরে এসেছিলেন।
তার অভিযোগ, আটক দুই যুবককে দিয়ে এনামুলের নাম বলিয়ে কিছু যুবক বাড়িতে হামলা চালিয়েছে। ওই ব্যক্তি আরও দাবি করেন, আটক যুবকরা প্রকৃতপক্ষে সুলতানপুর এলাকার অন্য এক মাদক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ইয়াবা কিনে এনেছিল। তিনি বলেন, এনামুলের বাবা এলাকায় অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন; হামলার ঘটনায় তাকেসহ পরিবারের সদস্যদেরও বাড়ি ছাড়তে হয়েছে।
ঘটনার দুই দিন পর মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, বাড়িটির বিভিন্ন কক্ষ ও আসবাবপত্র ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে আছে। পুরো বাড়িতে নীরবতা ও জনমানবহীন পরিবেশ বিরাজ করছে। স্থানীয়দের অনেকেই ঘটনার বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করেন।
বাড়ির গৃহকর্তা ফতেহাবাদ পীর সাহেব বাড়ি মাদ্রাসার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আলহাজ্ব মাওলানা কাজী আব্দুস সালাম পীর (৮২) সপরিবারে অন্যত্র চলে গেছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
দেবিদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান বলেন, **“এনামুল হক একজন নিয়মিত মাদক ব্যবসায়ী। তার বিরুদ্ধে দুটি মাদক মামলা এবং একটি নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা রয়েছে।”**
বাড়িঘর ভাঙচুরের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, **“এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে পুলিশ সংবাদ পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এসেছে।”**
স্থানীয়দের দাবি, মাদকের বিরুদ্ধে আইনগতভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে নিরপরাধ কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের ওপর যেন হামলা, ভাঙচুর কিংবা হয়রানি না হয়—এমনটিও নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ রবিউল হাসান
অনলাইন ইনচার্জঃ কবির মাহমুদ
অফিসঃ ফায়েনাজ টাওয়ার, ৮/এ,কালভার্ট রোড,পুরানা পল্টন, ঢাকা