
মাসুদ রানা,বেলকুচি,সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি: একসময় বেলকুচির মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন ছিল এখানকার জলপথ। নৌকায় চলাচল করতেন মানুষ, কৃষিপণ্য পৌঁছাত বাজারে, জলপথে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন জেলেরা। একই পানিতে গোসল, কাপড় ধোয়া ও গবাদিপশুর প্রয়োজন মেটানো—সবই ছিল মানুষের নিত্যদিনের জীবনযাত্রার অংশ।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে। বর্তমানে বেলকুচির গুরুত্বপূর্ণ একটি জলপথের বড় অংশ কচুরিপানায় ঢেকে গেছে। পানির ওপর এত ঘনভাবে কচুরিপানা জমেছে যে কোথাও কোথাও জলপথের অস্তিত্বই বোঝার উপায় নেই। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা কচুরিপানা, পচা উদ্ভিদ ও আবর্জনা থেকে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। বাড়ছে মশা-মাছির উপদ্রব। বন্ধ হয়ে গেছে নৌকা চলাচল, বাধাগ্রস্ত হচ্ছে কৃষিপণ্য পরিবহন ও মাছ আহরণ।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এক-দুই বছর নয়, স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী প্রায় দেড় যুগ ধরে এই পরিস্থিতি চললেও জলপথটি পুনরুদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ কোথায়?
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ২০১০ সাল থেকে বেলকুচির কলেজ–গরুর হাট এলাকা থেকে সুবর্ণসাড়া–তামাই সড়ক পর্যন্ত বিস্তৃত জলপথের বড় অংশ কচুরিপানায় আচ্ছাদিত। দীর্ঘ সময় ধরে একই সমস্যার সঙ্গে বসবাস করছেন জলপথের আশপাশের মানুষ।
জলপথের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে জীবন-জীবিকার সম্পর্ক
স্থানীয়দের অভিযোগ, কচুরিপানা জমে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। আগে যে জলপথ দিয়ে নৌকা চলত, কৃষিপণ্য পরিবহন হতো এবং জেলেরা মাছ ধরতেন, এখন সেখানে নৌকা চলাচলই প্রায় অসম্ভব।
কচুরিপানায় ঢেকে যাওয়ায় মাছ ধরার সুযোগও কমেছে বলে দাবি স্থানীয় মৎস্যজীবীদের। যারা একসময় এই জলপথের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করতেন, তাদের অনেকেই এখন বিকল্প পেশার দিকে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
পাড়ের বাসিন্দারা বলছেন, আগে এই পানিতেই তাদের সন্তানরা সাঁতার শিখত। মানুষ গোসল করত, কাপড় ধুত এবং গবাদিপশুর প্রয়োজন মেটানো হতো। এখন কচুরিপানায় ঢাকা ও পচা পানির কারণে সেই স্বাভাবিক ব্যবহার আর সম্ভব হচ্ছে না।
একজন স্থানীয় বাসিন্দার ভাষায়, “নদীর পাড়ে বসবাস করেও এখন নদী আমাদের কোনো কাজে আসে না।”
যমুনার সঙ্গে বেলকুচির সম্পর্ক শুধু নদী নয়, ইতিহাসও
বেলকুচির ইতিহাস গভীরভাবে জড়িয়ে আছে যমুনার সঙ্গে। নদী যেমন এই জনপদকে দিয়েছে জীবন, তেমনি ভাঙন ও বন্যায় কেড়ে নিয়েছে বসতভিটা, স্থাপনা ও জনপদ।
স্থানীয় প্রবীণদের স্মৃতিতে, পুরোনো বেলকুচির বড় অংশ একসময় যমুনার ভাঙনে বিলীন হয়ে যায়। সরকারি ও স্থানীয় ইতিহাসের বিভিন্ন তথ্যেও নদীভাঙনের কারণে পুরোনো জনপদের স্থানান্তরের বিষয়টি উঠে এসেছে।
১৯২১ সালে বেলকুচি থানা দেলুয়াতে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে যমুনার ভাঙনে তৎকালীন থানার স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এরপর সোহাগপুর কালিদাস চৌধুরীর জমিদার বাড়ির পরিত্যক্ত ভবনে থানার কার্যক্রম শুরু হয়। নদীর ভাঙন ও জনপদের পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে প্রশাসনিক কেন্দ্রও নতুন এলাকায় গড়ে ওঠে।
বেলকুচির নদীভাঙন মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় প্রতিরক্ষা বাঁধ। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৫-৬৬ অর্থবছরে বেলকুচি রক্ষা বাঁধ নির্মাণের কার্যক্রম শুরু হয়। উদ্দেশ্য ছিল যমুনার বন্যা ও ভাঙনের ভয়াবহতা থেকে জনপদকে সুরক্ষা দেওয়া।
পরবর্তী সময়ে এই বাঁধকে ঘিরেই নতুন বেলকুচির জনবসতি ও প্রশাসনিক কাঠামোর বিস্তার ঘটে। স্থানীয় ইতিহাসের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৩ সালে বেলকুচি উপজেলা হিসেবে উন্নীত হয় এবং ১৯৯১ সালে বেলকুচি রক্ষা বাঁধের পশ্চিম তীরঘেঁষা এলাকায় বর্তমান বেলকুচি থানার কার্যক্রম পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
অর্থাৎ, যে নদী একসময় পুরোনো বেলকুচির জনপদ ও প্রশাসনিক স্থাপনা গিলে নিয়েছিল, সেই নদীর বিরুদ্ধেই নির্মিত বাঁধের পাশে গড়ে উঠেছে নতুন বেলকুচির প্রশাসনিক ও নাগরিক জীবন।
ইতিহাসের জলপথ আজ কচুরিপানার নিচে
আজ সেই বেলকুচির বহু এলাকার জীবনযাত্রায় একসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা জলপথটি কচুরিপানায় ঢাকা পড়ে আছে।
আজগড়া, মেঘুল্লা, কামারপাড়া, বড়ধুলের বিভিন্ন এলাকা, মুকুন্দগাঁতি, চালা, সুবর্ণসাড়া, তামাই, সমেশপুর ও সায়দাবাদসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষের সঙ্গে জলপথের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগাযোগ ছিল বলে জানান স্থানীয়রা।
সড়ক যোগাযোগের বর্তমান বিস্তারের আগে কৃষিপণ্য ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনে নৌপথের ওপর নির্ভরতা ছিল বেশি। স্থানীয় প্রবীণদের স্মৃতিতে, একসময় এই জলপথে নৌযান চলাচল ছিল স্বাভাবিক। কোথাও কোথাও লঞ্চ, স্টিমার ও ফেরিঘাট থাকার কথাও তারা উল্লেখ করেন।
তবে এসব ঐতিহাসিক দাবির পূর্ণাঙ্গ যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজন সরকারি নথি, পুরোনো মানচিত্র ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের রেকর্ড পর্যালোচনা।
দায়িত্ব কার?
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই জলপথটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কোন দপ্তরের?
যদি এটি খাল বা সরকারি জলাশয় হিসেবে নথিভুক্ত হয়ে থাকে, তাহলে নিয়মিত কচুরিপানা অপসারণের ব্যবস্থা নেই কেন?
যদি পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন হয়, তাহলে এত বছর ধরে কচুরিপানা অপসারণ হয়নি কেন?
আর যদি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থাকে, তাহলে তারা কী ব্যবস্থা নিয়েছে?
গত ১৬ বছরে কোনো প্রকল্প বা সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল কি না, হয়ে থাকলে কত টাকা বরাদ্দ ও ব্যয় হয়েছে—এসব তথ্যও জনসম্মুখে আসা প্রয়োজন।
শুধু পরিষ্কার নয়, প্রয়োজন স্থায়ী সমাধান
স্থানীয়দের দাবি, একবার কচুরিপানা পরিষ্কার করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। প্রথমে জলপথটির সীমানা, গভীরতা ও পানির প্রবাহ জরিপ করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী খনন করতে হবে। একই সঙ্গে কচুরিপানা অপসারণের পাশাপাশি পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।
তাদের আরও দাবি, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য স্থায়ী ব্যবস্থা না করলে কয়েক বছর পর আবারও একইভাবে কচুরিপানা জমে জলপথ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
উন্নয়নের যুগে হারিয়ে যাচ্ছে পুরোনো জলপথ
আজ বেলকুচিতে সড়ক যোগাযোগ অনেক বিস্তৃত। সায়দাবাদ–এনায়েতপুর আঞ্চলিক সড়ক গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু সড়ক যোগাযোগের উন্নয়নের পাশাপাশি পুরোনো জলপথগুলো যদি হারিয়ে যায়, তাহলে কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ ও স্থানীয় জলব্যবস্থার ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হবে—সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
একদিকে যমুনার ভাঙন এখনো বেলকুচির মানুষের জন্য বাস্তব সংকট, অন্যদিকে নদীর সঙ্গে যুক্ত পুরোনো জলপথ কচুরিপানায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
অর্থাৎ—নদী আছে, জলপথ আছে; কিন্তু মানুষের ব্যবহারযোগ্য পানি ও নৌপথ নেই।
এখন সময় জবাবদিহির
প্রায় দেড় যুগ ধরে একটি জলপথ কচুরিপানায় আটকে থাকার অভিযোগ শুধু স্থানীয় দুর্ভোগের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িত কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, যোগাযোগ এবং সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন।
তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্থানীয়দের প্রশ্ন—
কত বছর ধরে জলপথটি কচুরিপানায় আক্রান্ত?
কখন সর্বশেষ কচুরিপানা অপসারণ করা হয়েছিল?
কোন দপ্তরের দায়িত্বে এটি?
গত ১৬ বছরে কোনো প্রকল্প বা বরাদ্দ হয়েছিল কি?
হয়ে থাকলে কত টাকা বরাদ্দ ও ব্যয় হয়েছে?
কাজ হয়ে থাকলে বর্তমান পরিস্থিতি এমন কেন?
আর কোনো বরাদ্দ না হয়ে থাকলে—কেন হয়নি?
বিএনপি সরকারের নবনির্বাচিত সিরাজগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য আমিরুল ইসলাম খানের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, তিনি বিষয়টি সরেজমিনে পরিদর্শন করবেন, সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করবেন এবং জলপথটি পুনরুদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে ভূমিকা রাখবেন।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত সরেজমিন তদন্ত করে জলপথের বর্তমান অবস্থা নির্ধারণ, কচুরিপানা অপসারণ, প্রয়োজনীয় খনন এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা হোক।
কারণ এটি শুধু একটি জলপথ পরিষ্কারের দাবি নয়—এটি বেলকুচির হারিয়ে যাওয়া নৌপথ, জীবিকা ও জলজ পরিবেশ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি।
একসময় যমুনার ভাঙনে বারবার বদলে গেছে বেলকুচির মানচিত্র। সেই নদীর সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের সাক্ষী বেলকুচি রক্ষা বাঁধ আজও দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে— যে বেলকুচির জীবন একসময় নদী, নৌপথ, মাছ ও কৃষিকে ঘিরে আবর্তিত হতো, সেই বেলকুচির কচুরিপানার নিচে চাপা পড়ে থাকা ঐতিহাসিক জলপথ কি আবার প্রাণ ফিরে পাবে—নাকি নীরবেই হারিয়ে যাবে ইতিহাসের আরেকটি জলপথ?
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ রবিউল হাসান
অনলাইন ইনচার্জঃ কবির মাহমুদ
অফিসঃ ফায়েনাজ টাওয়ার, ৮/এ,কালভার্ট রোড,পুরানা পল্টন, ঢাকা