
ক্ষমতার বাইরে এবং দেশে দলীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার মধ্যেই নতুন করে সাংগঠনিক তৎপরতার খবর আসছে আওয়ামী লীগকে ঘিরে। ভারতে অবস্থানরত কেন্দ্রীয় নেতাদের দিল্লিতে ডেকে মতবিনিময়ের উদ্যোগ নিয়েছেন দলটির সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে তাঁর সম্ভাব্য দেশে ফেরা এবং বেনাপোল থেকে টুঙ্গিপাড়া পর্যন্ত নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ত করে ‘লং মার্চ টু টুঙ্গিপাড়া’র মতো কর্মসূচি নিয়েও দলটির ভেতরে আলোচনা হয়েছে বলে কয়েকটি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তবে এ কর্মসূচি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি।
১৮ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে শেখ হাসিনার মতবিনিময়ের কথা ছিল। দিল্লি ও কলকাতায় অবস্থানরত কেন্দ্রীয় কমিটির ২১ জন নেতার এতে অংশ নেওয়ার কথা জানানো হয়। কেন্দ্রীয় কমিটির বাইরের কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী ও নেতার উপস্থিত থাকার কথাও প্রতিবেদনে এসেছে। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ভারতে থাকা কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে শেখ হাসিনা মতবিনিময় করবেন এবং নির্দিষ্ট কোনো এজেন্ডা নেই।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে শেখ হাসিনার এ ধরনের সশরীর বৈঠককে সাংগঠনিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বিদেশে থাকা দলীয় নেতাদের সঙ্গে তাঁর ভার্চুয়াল যোগাযোগ অব্যাহত ছিল।
দলটির কয়েকজন নেতার বক্তব্যের ভিত্তিতে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান সাংগঠনিক পরিস্থিতি এবং শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরা নিয়েও দলের ভেতরে আলোচনা চলছে। তবে কখন, কোন পথে এবং কোন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনি দেশে ফিরবেন—এসব বিষয়ে নিশ্চিত সরকারি বা আনুষ্ঠানিক দলীয় ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ‘লং মার্চ টু টুঙ্গিপাড়া’। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা যদি ভারত থেকে পেট্রাপোল-বেনাপোল স্থলবন্দর হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন, তাহলে সেখান থেকে টুঙ্গিপাড়া পর্যন্ত নেতাকর্মীদের নিয়ে কর্মসূচি আয়োজনের সম্ভাবনা নিয়ে দলীয় পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রহমানের বক্তব্যও ওই প্রতিবেদনে উদ্ধৃত হয়েছে। তিনি দেশে ফেরার পথ নির্ধারণে নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিষয় থাকার কথা বলেছেন।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ‘লং মার্চ টু টুঙ্গিপাড়া’কে আওয়ামী লীগের ঘোষিত কর্মসূচি হিসেবে উপস্থাপন করার মতো তথ্য এখনো পাওয়া যাচ্ছে না। এটি সম্ভাব্য পরিকল্পনা বা অভ্যন্তরীণ আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক শক্তি মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও অতীতের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা কঠিন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দলটির দীর্ঘ সময় বিরোধী দলে থাকার ইতিহাস রয়েছে। ১৯৭৫-পরবর্তী সময়ে ক্ষমতার বাইরে থেকেও দলটি সংসদ ও রাজপথে সক্রিয় ছিল। ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের মধ্যে ৩৯টি আসন পেয়েছিল এবং পরে সংসদের ভেতরে ও বাইরে রাজনৈতিক কর্মসূচি চালায়।
১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দেশে ফেরার পর দলটির বিভিন্ন অংশকে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ নেন। এরপর এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগ গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে সক্রিয় ছিল। ১৯৮০-এর দশকে দলটি কখনো নির্বাচনে অংশ নেয়, কখনো নির্বাচন বর্জন করে এবং অন্যান্য বিরোধী দলের সঙ্গে আন্দোলনে যুক্ত হয়।
১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ প্রধান বিরোধী দল হিসেবে সংসদে যায়। এরপর বিএনপি সরকারের সময় বিরোধী দল হিসেবে আন্দোলন চালিয়ে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে ২১ বছর পর সরকার গঠন করে।
২০০১ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর আওয়ামী লীগ আবার বিরোধী দলে যায়। ওই নির্বাচনে দলটি ৩০০ আসনের মধ্যে ৬২টি আসন পেয়েছিল। পরবর্তী কয়েক বছরে দলটি সরকারবিরোধী আন্দোলন, নির্বাচনব্যবস্থা ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে আন্দোলন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে দলটি আবার সরকার গঠন করে।
তবে ২০২৬ সালের পরিস্থিতি আগের বিরোধী-দলীয় সময়গুলোর সঙ্গে এক নয়। বর্তমানে দেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ১৯৯১-৯৬ কিংবা ২০০১-০৬ সময়ের মতো স্বাভাবিক সংসদীয় বিরোধী দলের কাঠামোয় দলটি রাজনীতি করছে না। এ কারণে অতীতের সাংগঠনিক সক্ষমতা থেকে বর্তমান শক্তি সরাসরি নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
তারপরও দলটির সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্যও নেই। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বিদেশে ও দেশের ভেতরে থাকা নেতাকর্মীদের অনলাইন তৎপরতা এবং বিভিন্ন সাংগঠনিক ইউনিট পুনর্বিন্যাসের কথা এসেছে। তবে এসব তৎপরতা বাস্তবে কত বড় জনসমর্থন বা মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক সক্ষমতায় রূপ নিয়েছে, তার স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য পরিমাপ বর্তমানে সীমিত।
ফলে দিল্লির বৈঠক এবং শেখ হাসিনার দেশে ফেরাকে কেন্দ্র করে আলোচিত পরিকল্পনাগুলো আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসের প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু ‘লং মার্চ টু টুঙ্গিপাড়া’ বাস্তবে হবে কি না, শেখ হাসিনা কবে বা কীভাবে দেশে ফিরবেন এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ কতটা মাঠপর্যায়ের শক্তি প্রদর্শন করতে পারবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত। পরবর্তী আনুষ্ঠানিক দলীয় ঘোষণা ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক-আইনি পরিস্থিতিই এ বিষয়ে আরও পরিষ্কার ধারণা দেবে।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ রবিউল হাসান
অনলাইন ইনচার্জঃ কবির মাহমুদ
অফিসঃ ফায়েনাজ টাওয়ার, ৮/এ,কালভার্ট রোড,পুরানা পল্টন, ঢাকা