
আমজাদ হোসেনঃ বিশেষ প্রতিনিধি কুমিল্লা:(উত্তর)
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) সংসদীয় আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’র প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণার দাবিতে দায়ের করা রিট আবেদন খারিজ করেছেন মহামান্য হাইকোর্ট। এর ফলে নির্বাচন কমিশন (ইসি)’র প্রার্থিতা বাতিলসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বহাল থাকলো এবং আপাতত নির্বাচনী মাঠে অংশগ্রহণের সুযোগ হারালেন বিএনপি প্রার্থী।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) দুপুরে হাইকোর্ট ডিভিশনের বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি মো. আনোয়ারুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ শুনানি শেষে এই আদেশ দেন।
নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত বহাল
আদালতের এ রায়ে নির্বাচন কমিশনের পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত বহাল থাকায় মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়নপত্র বাতিলই চূড়ান্ত হিসেবে গণ্য হচ্ছে। ফলে কুমিল্লা-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থীতা এখনো অবৈধ অবস্থাতেই রয়েছে।
এর আগে গত শনিবার (১৭ জানুয়ারি) বিকেলে নির্বাচন কমিশনের আপিল শুনানিতে রিটার্নিং কর্মকর্তার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত স্থগিত করে বিএনপি প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়ন বাতিল ঘোষণা করা হয়। একই শুনানিতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)’র প্রার্থী হাসনাত আব্দুল্লাহর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করে ইসি।
উল্লেখ্য, প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা মু. রেজা হাসান বিএনপি প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেছিলেন। তবে পরবর্তীতে আপিল শুনানিতে এসে সেই সিদ্ধান্ত পাল্টে যায়।
পাল্টাপাল্টি আপিল ও অভিযোগের সূত্রপাত
কুমিল্লা-৪ আসনে বিএনপি ও এনসিপি প্রার্থীর মধ্যে মনোনয়ন বৈধতা নিয়ে শুরু হয় আইনি লড়াই। নির্বাচন কমিশনে একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি আপিল করেন দুই প্রার্থী।
বিএনপি প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী অভিযোগ করেন, এনসিপি প্রার্থী হাসনাত আব্দুল্লাহর দাখিল করা হলফনামায় স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য উপস্থাপনায় অসঙ্গতি রয়েছে।
অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী হাসনাত আব্দুল্লাহ নির্বাচন কমিশনে দায়ের করা আপিলে দাবি করেন, বিএনপি প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী একজন ঋণখেলাপি এবং আইন অনুযায়ী তিনি সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য।
ঋণখেলাপি সংক্রান্ত জটিলতা
নির্বাচন কমিশনের তদন্তে দেখা যায়, ‘মাম পাওয়ার লিমিটেড’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর বিরুদ্ধে ঋণ সংক্রান্ত তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি (ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো) তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ কারণেই তাকে ঋণখেলাপি হিসেবে বিবেচনা করে নির্বাচন কমিশন তার মনোনয়ন বাতিল করে।
এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী প্রথমে ঢাকার পঞ্চম যুগ্ম জেলা জজ আদালতে মামলা দায়ের করলেও গত ৫ নভেম্বর সেই মামলা খারিজ হয়। পরে তিনি হাইকোর্টে আপিল করলে গত ৮ ডিসেম্বর আদালত সাময়িকভাবে তার নাম ঋণখেলাপির তালিকায় প্রকাশ না করার নির্দেশ দেন।
পরবর্তীতে ঋণের আংশিক পরিশোধ ও পুনঃতফসিলের মাধ্যমে গত ১৪ জানুয়ারি তিনি ঋণখেলাপি তালিকা থেকে অব্যাহতির আবেদন করেন। বিষয়টি নিয়ে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতের বিচারপতি ফারাহ মাহবুব দুই সপ্তাহের মধ্যে রুল নিষ্পত্তির নির্দেশ দিলেও চূড়ান্তভাবে ঋণখেলাপি সংক্রান্ত আদেশ বহাল থাকে।
হাইকোর্টে রিট খারিজ
নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী যে রিট আবেদন দায়ের করেছিলেন, বুধবার সেটি খারিজ করে দেন হাইকোর্ট। ফলে আইনগতভাবে তার প্রার্থিতা বাতিলই বহাল থাকলো।
নির্বাচনী মাঠের বর্তমান চিত্র
হাইকোর্টে রিট খারিজ হওয়ায় কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) আসনের নির্বাচনী মাঠে বড় পরিবর্তন এসেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল থাকায় এখন এই আসনে ‘১০ দলীয় নির্বাচনী জোট’-এর প্রার্থী হিসেবে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)’র দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ কার্যত শক্ত অবস্থানে রয়েছেন।
পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের ইঙ্গিত
তবে বিএনপি প্রার্থীর আইনজীবীরা জানিয়েছেন, হাইকোর্টের এই আদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। আপিল বিভাগে যদি অনুকূল আদেশ পাওয়া যায়, তবেই মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর নির্বাচনে অংশগ্রহণের পথ খুলতে পারে।
বর্তমানে কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) আসনের প্রার্থিতা সংক্রান্ত চূড়ান্ত ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তের ওপর।
Leave a Reply