
মোঃ আমজাদ হোসেন,বিশেষ প্রতিনিধি-কুমিল্লাঃ কুমিল্লার দেবিদ্বারে এক আলোচিত ঘটনার জন্ম দিয়েছে পৌর যুবলীগ নেতা কাজী তরিকুল ইসলাম সুমন (৩৮)-এর গ্রেফতার।
যে খবরে অন্যরা হয়তো স্তব্ধ, সেখানে সাধারণ সিএনজি ও অটোরিকশা চালকদের মুখে দেখা গেছে স্বস্তির হাসি ও আনন্দের উল্লাস।
রবিবার (১২ অক্টোবর) বিকেলে দেবিদ্বার-চান্দিনা সড়কের সিএনজি স্ট্যান্ডে চালকদের উদ্যোগে মিষ্টি বিতরণের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় সেই দীর্ঘদিনের দমিয়ে রাখা আনন্দ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দেবিদ্বার পৌর যুবলীগের সহ-সভাপতি কাজী সুমন দীর্ঘদিন ধরে ওই সড়কে ‘জিপি’ নামের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দিতেন।
তার নিয়ন্ত্রণে চলত চাঁদা আদায়, ভয়ভীতি, মারধর এবং গাড়ি আটকে রাখার মতো কর্মকাণ্ড।
যে চালক তার কথার অবাধ্য হতো, তাকে সড়কে নামতে দেওয়া হতো না।
কেউ কেউ জীবিকার তাগিদে সড়কে চলাচলের অনুমতি পেতে বাধ্য হয়ে বড় অঙ্কের অর্থ দিতে হতো।
একজন অভিজ্ঞ সিএনজি চালক বলেন,
“আমরা দিনমজুর মানুষ, কষ্ট করে যা আয় করি তার অর্ধেক দিতে হতো চাঁদা হিসেবে। না দিলে গাড়ি আটক, মারধর — সব চলত। আজ মনে হচ্ছে বুকের উপর থেকে পাহাড় নেমে গেছে।”
চালকদের অনেকে বলেন, দীর্ঘ সাড়ে ১৬ বছর ধরে চলেছে তার একচ্ছত্র আধিপত্য, যেন স্ট্যান্ডটি ব্যক্তিগত সম্পত্তি হয়ে উঠেছিল।
প্রতিদিন নতুনভাবে বেড়ে চলা অত্যাচারে সাধারণ চালকরা ভয়ে মুখ খুলতে পারতেন না।
গত শনিবার (১১ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় এক নারী নির্যাতন মামলায় সেনা সদস্যরা কাজী সুমনকে গ্রেফতার করে থানায় হস্তান্তর করেন।
পরে থানার জিজ্ঞাসাবাদে উঠে আসে তার আরেকটি আলোচিত নাম —
গত বছরের ৪ আগস্ট বৈষম্য বিরোধী ছাত্র জনতার আন্দোলনে নিহত সেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহবায়ক আব্দুর রাজ্জাক রুবেল হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি।
খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই দেবিদ্বার-চান্দিনা সড়কের চালকদের মাঝে দেখা যায় স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দোৎসব।
কেউ হাসছেন, কেউ মিষ্টি বিলাচ্ছেন, কেউবা ফোনে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন সহকর্মীদের।
সিএনজি স্ট্যান্ডজুড়ে তখন যেন উৎসবের আমেজ।
চালকদের অনেকে বলেন, “আমরা বহু বছর অন্যায়ের বিরুদ্ধে চুপ থেকেছি। আজ মনে হচ্ছে আল্লাহ আমাদের ডাকে সাড়া দিয়েছেন। প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানাই, যেন এমন সব অন্যায়কারীর বিচার হয়।”
এ সময় স্থানীয়রা আরও বলেন, দেবিদ্বারে এ ধরনের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দৌরাত্ম্য বহুদিনের পুরোনো ক্ষত, যা থেকে মানুষ মুক্তি চায়।
তারা আশা প্রকাশ করেন, প্রশাসন যেন অন্য অবৈধ দখলদার ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধেও দ্রুত ব্যবস্থা নেয়।
কাজী তরিকুল ইসলাম সুমন দেবিদ্বার পৌর এলাকার মরহুম কাজী আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে।
তিনি একসময় সাবেক সংসদ সদস্য রাজী মোহাম্মদ ফখরুলের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং দেবিদ্বার উপজেলার বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তার করতেন।
সড়কের নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে স্থানীয় রাজনীতি — সর্বত্রই ছিল তার “নায়কতন্ত্রের” ছাপ।
তবে হাসিনা সরকার পতনের পর থেকে তিনি আত্মগোপনে ছিলেন, এবং হঠাৎ করেই রাজধানীতে গ্রেফতার হন।
দেবিদ্বারের সিএনজি চালক সমাজের মুখে এখন একটাই কথা : “আমরা শান্তিতে রাস্তায় নামতে চাই, ভয়ে নয় — অধিকার নিয়ে।”
Leave a Reply